সাদ বিন রেজা সাম্প্রতিক কালের সবচেয়ে বিখ্যাত লেখক। বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ সব পুরস্কার-ই করয়ায়ত্ত করে ফেলেছেন অল্প বয়সে।বেশি হলে তার বয়স হবে ত্রিশ।এই অল্প বয়সের মধ্যে এমন আকাশ্চুম্বী জনপ্রিয়তা আর কোন লেখক পেয়েছেন বলে কারও জানা নেই।সাদ বিন রেজার বই হটডগের মত বিক্রি হয় যাকে বলে পাবলিক খায়।শুধু খায় বললে ভুল হবে গোগ্রাশে খায়।সবশ্রেনীর পাঠকদের কাছেই তার সমান জনপ্রিয়তা।এমন ঈর্ষনীয় জনপ্রিয়তা পেলেও তার সাহিত্য সাধনার বয়স কিন্তু খুব বেশি না।বড়জ়োড় ছয় সাত বছর।
সাদ বিন রেজা সব্যসাচী লেখক।তিনি গল্প,উপন্যাস,কবিতা,নাটক সব ই লেখেন।বর্তমানে টিভি চ্যানেলগুলোর প্রায় আশি ভাগ নাটক ই তার লেখা।লেখক তাই খুব ব্যস্ত থাকেন লেখা নিয়ে।নিজের যে একটা জীবন আছে তাও প্রায় ভুলে যেতে বসেছিলেন। কিন্তু দুই বছর আগে বিয়ে করেন।তার স্ত্রী ও উচ্চশিক্কিত মহিলা এবং তার লেখার খুব ভক্ত।বিয়ে করলেও লেখক লেখার চাপ থেকে বেরোতে পারলেন না।আর লেখকের একটি সমস্যা আছে।তিনি যখন কোন গল্প লেখেন তখন পুরোপুরি গল্পটার ভিতর ঢুকে যান।আশপাশের পৃথিবীর দিকে তখন তার তেমন কোন নজর থাকে না।লেখার মধ্যেই ডুবে থাকেন।তাই লেখকের দাম্পত্যজীবন খুব একটা সুখের হল না।বিয়ের এক বছরের মাথায় লেখক জনক হলেন।লেখকের কন্যাসন্তান টির নাম মিলি।পৃথিবীতে এই একটা জিনিসকেই মনে হয় লেখক লেখার চাইতে বেশি ভালবাসেন।
লেখক আজ ভিতরে কেমন যেন অস্তিরতা অনুভব করছেন।কি হবে এই খ্যতি এত সম্মান দিয়ে?বুকের ভিতরে লেখক গভির চাপের আভাস পেলেন।যারা খুব বেশী জনপ্রিয়তা পেয়ে যান তাদের মধ্যে মাঝে মাঝে গভীর শুন্যতা ভর করে।লেখকের কাছে আজ এই শুন্যতা ধরা দিল।কয়েক মাস আগে তার স্ত্রী মেয়েকে নিয়ে চলে গেছেন।লেখক এখন একাই থাকেন বাসায়।কিন্তু এরকম কোন গভীর শুন্যতা আগে কখনও গ্রাস করতে চায়নি তাকে,আজ যেমন করতে চাইছে।লেখকের হঠাত বুঝতে পারলেন তিনি বড় অসহায়।জনপ্রিয়তার জন্য তার নিজের মনের বিরুধ্যে ও অনেক কাজ করতে হয়।লেখকের বুকের ভিতরে চিনচিনে ব্যথা করতে লাগল।লেখক ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন সাত টা বিশ বাজে।আজ অনেক লেখা বাকি।তবু লেখকের কিছুই লেখতে ইচ্ছা করছে না।তার আর বাচতে ইচ্ছা করছে না। লেখক সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি মরে যাবেন। আত্নহত্যা করবেন।তার কাছে জীবনকে এখন যন্ত্রনা মনে হচ্ছে।তিনি এই যন্ত্রনা থেকে মুক্তি চান।
সাড়ে সাতটার দিকে লেখক বাসা থেকে বের হলেন।বাসার সামনেই লম্বা গলি।গলিটার শেষমাথার বা পাশে একটা বড় ফার্মেসি।ওষুধ থেকে শুরু করে অনেক রাসায়নিক পদার্থ ও এখানে পাওয়া যায়।লেখক ঠিক করলেন ওই দোকানটাতেই যাবেন।লেখক এখন এক মুহুর্থ ও সহ্য করতে পারছেন না।তিনি এখন মৃত্যু চান।গাঢ় গভীর মৃত্যু।লেখকের বুকের ভিতরটা কেমন যেন খালি খালি মনে হল।একটা চাপা আর্তনাদ বেরিয়ে আসতে চাইছে বুকের ভিতর থেকে।লেখক যখন দোকানটাতে পৌছলেন তখন দোকানে একজন মাঝবয়ষী ভদ্রলোক ও একটি কমবয়ষী ছেলে বসে ছিল।লেখক সোজাসোজি গিয়ে বল্লেন,ভাই এক বোতল আর্সে-নিক দেন।
লেখকের রুক্ষ চেহারা আর উস্কখুস্ক চুলের দিকে মাঝবয়সী ভদ্রলোক তাকিয়ে রইলেন।দিবেন কি দিবেন না হয়ত ভাবছেন।এমন সময় পাশের কমবয়ষী ছেলেটা বলল, আপনি লেখক সাদ বিন রেজা না?
লেখক কিছু বলবার আগেই ছেলেটা খাতা বের এগিয়ে এল।অটোগ্রাফ চায়।লেখক অটোগ্রাফ দিলেন।মনে মনে বললেন এই শেষ অটোগ্রাফ।লেখলেনঃ সাদ বিন রেজা, নামের নিচে ছোট ছোট অক্করে লিখলেন , ভাল থেক পৃথীবিবাসী।এটাই লেখকের শেষ লেখা হয়ত কারন লেখক আজ আত্নহত্যা করবেন। লেখকের পরিচয় পেয়ে নিশ্চিন্তমনে দোকানদার আর্সে-নিক দিল।লেখক বোতলটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললেন তোকে দিয়েই আজ জীবন তৃষঙ্গ মিটাব।লেখক বোতলটা নিয়ে বাসার দিকে হাটতে লাগলেন।তার মাথাটা কেমন যেন ভারী ভারী মনে হতে লাগল।তার মনে হল চারপাশটা যেন আস্তে আস্তে দুলছে।প্রায় অর্ধেক রাস্তা লেখক এমন করে আসলেন।হঠাত ডানপাশের একটা গলি থেকে চিতকার চেচামেচির শব্দে লেখক থেমে গেলেন।তার কৌতোহল হল গিয়ে দেখবেন কি হচ্ছে।লেখালেখির কাজে ব্যস্ত থাকায় অনেকদিন সাধারন মানুষদের সংস্পর্শ্মুক্ত তিনি।আজ না হয় জীবনের শেষবেলায় তাদের সান্নিধ্যেই কিছুটা সময় কাটুক।লেখক চেচামেচির শব্দটা লক্ক করে হাটতে লাগলেন।
একটু এগুতেই দেখতে পেলেন ছোট একটা ভীড়।ভীড় টেলে একটু ভেতরে যেতেই লেখক দেখতে পেলেন একটা বাচ্চা পড়ে আছে।বাচ্চাটার ঘাড়ের পাশটাতে বড় ক্ষত।রক্ত ঝরছে। লেখক একটা লোক কে জিজ্ঞাসা করলেন, বাচ্চাটা এখানে এল কি করে?
উত্তরে লোকটা বলল, বুঝলেন না, কুকাম কইরা পয়দা করছে।তারপর ডাস্টবিনে ফালাইয়া গেছে। শেয়াল টানতে টানতে এখানে আনছে।
লেখক ছোট বাচ্চাটার দিকে ভাল করে তাকালেন।বাচ্চাটা কাদছে।কাদার কোন শব্দ শোনা যাচ্ছে না।শব্দ করার শক্তি হয়ত বাচ্চাটার নেই।লেখক লক্ষ করলেন ঘাড়ের ক্ষতটার রক্ত বাচ্চাটার সারা গায়ে লেগে মাখামাখি।লেখক হটাত ভীষন এক দায়বদ্ধতা অনুভব করলেন।অপরাধবোধ তার মনে জেগে উঠল।তিনি এত বিখ্যাত,জনপ্রিয় লেখক, কত গল্প, নাটক লিখেন কিন্তু এদের নিয়ে কি কিছু লিখেছেন? লেখকের হাত থেকে আর্সে-নিকের বোতলটা পরে গেল।তিনি পথের বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিলেন।এদের জন্য ই এখন তার বাচতে হবে।সমাজের অসহায় মানুষদের জন্য তার অনেক কিছু করার যে বাকী রয়ে গেছে।